ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মাধ্যমে নতুন সংসদের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। আগামী ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন আহ্বান করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তবে আগের সংসদের স্পিকার পদত্যাগ এবং ডেপুটি স্পিকার কারাগারে থাকায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন—তা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর বিএনপি জোট তারেক রহমান-কে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী–এনসিপি জোটের বৈঠকে ডা. শফিকুর রহমান-কে বিরোধীদলীয় নেতা এবং নাহিদ ইসলাম-কে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মনোনীত করা হয়েছে।
প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব কে করবেন?
সংবিধান অনুযায়ী, সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান বাধ্যতামূলক। সেই বিধান মেনেই ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন বসছে।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হবে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন।
কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে—
- আগের স্পিকার পদত্যাগ করেছেন
- ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিত
এ অবস্থায় সংসদ বিষয়ক গবেষকদের মতে, কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনো ব্যক্তি প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করতে পারেন। অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ ও অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন মনে করেন, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য থাকলে রাষ্ট্রপতির মনোনয়নেই অধিবেশন শুরু করা সম্ভব।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন প্রক্রিয়া
প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার কথা। প্রক্রিয়াটি সাধারণত এভাবে হয়—
- একজন সংসদ সদস্য স্পিকার হিসেবে কারও নাম প্রস্তাব করবেন।
- অন্য একজন সদস্য প্রস্তাবটি সমর্থন করবেন।
- প্রস্তাবিত প্রার্থী দায়িত্ব পালনে সম্মত আছেন—এ মর্মে লিখিত বিবৃতি দিতে হবে।
- একাধিক প্রার্থী থাকলে ভোটাভুটি হবে, না থাকলে কণ্ঠভোটে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর তার সভাপতিত্বে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হয়। এরপর অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয় এবং রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথ পাঠ করান। শপথের পর তাদের সভাপতিত্বেই সংসদের কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
হুইপ ও বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকা
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পর সংসদে গুরুত্বপূর্ণ পদ হলো সরকারি দলের চিফ হুইপ ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
চিফ হুইপের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—
- দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা
- সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা
- বিলের পক্ষে দলীয় ভোট নিশ্চিত করা
- বক্তব্যের সময়সীমা নির্ধারণ
আইন অনুযায়ী, বিরোধীদলীয় নেতা পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন।
বর্তমানে সরকারি দল হিসেবে বিএনপি সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করলেও উপনেতা ও চিফ হুইপের নাম এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা হয়নি।
সব মিলিয়ে, স্পিকার-ডেপুটি স্পিকারের অনুপস্থিতিতে প্রথম অধিবেশন পরিচালনা এবং পরবর্তী নির্বাচন প্রক্রিয়া—দুই বিষয়ই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
03
‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণ করা হবে আগামী ১০ মার্চ থেকে
প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনতে পরীক্ষামূলকভাবে ১৩টি উপজেলায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আগামী ১০ মার্চ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
রোববার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ফ্যামিলি কার্ড সংক্রান্ত কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শুরুতে দুটি উপজেলায় পাইলটিংয়ের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাড়িয়ে ১৩টি উপজেলার ১৩টি ওয়ার্ডে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা জানান, ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে হতদরিদ্র ও দরিদ্র পরিবারকে কাঠামোবদ্ধ সহায়তা দেওয়া হবে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রজ্ঞাপন জারি করে এ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে।
যেভাবে নির্ধারণ হবে উপকারভোগী
- এনআইডি তথ্য ব্যবহার করা হবে
- সরেজমিন যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করা হবে
- পরিবারগুলোকে চার শ্রেণিতে ভাগ করা হবে: হতদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত
- এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ ও মোবাইল নম্বর বাধ্যতামূলক থাকবে
- অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সঙ্গে আন্তঃসংযোগ করে দ্বৈত সুবিধা রোধ করা হবে
অর্থ বিভাগের সচিব জানান, ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, টিসিবি কার্ড এবং ভ্যালনারেবল উইমেন বেনিফিটসহ একাধিক কর্মসূচি একীভূত করা হবে। বর্তমানে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রায় ৫০ শতাংশ টার্গেটিং ত্রুটি রয়েছে, যা এই উদ্যোগের মাধ্যমে কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রী বলেন, একটি ফ্যামিলি কার্ডে একটি পরিবারের পাঁচজন সদস্য বিবেচনায় নেওয়া হবে। একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য সংখ্যা বেশি হলে প্রতি পাঁচজনের জন্য আলাদা কার্ড দেওয়া হবে। একই ব্যক্তি একাধিক ভাতা পাবেন না, তবে পরিবারের অন্য সদস্যরা ভাতা পেতে পারবেন।
যেসব এলাকায় পাইলট কার্যক্রম শুরু হবে
প্রাথমিকভাবে নিম্নোক্ত এলাকাগুলোতে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে—
- বনানীর কড়াইল বস্তি
- পাংশা উপজেলা
- পতেঙ্গা
- বাঞ্ছারামপুর উপজেলা
- লামা উপজেলা
- খালিশপুর
- চরফ্যাশন উপজেলা
- দিরাই উপজেলা
- ভৈরব উপজেলা
- বগুড়া সদর উপজেলা
- লালপুর উপজেলা
- ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা
- নবাবগঞ্জ উপজেলা
উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে কমিটি গঠন করে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে উপকারভোগীর তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। অনুদানের অর্থ ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। নারীপ্রধান পরিবারগুলোর নামে কার্ড ইস্যু করা হবে, এবং সংশ্লিষ্ট নীতিমালা অনুযায়ী ভাতা প্রদান করা হবে।